Latest news

যে যুদ্ধে প্রতিপক্ষ শুধুই মানুষ!

শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল ২০২০ | ৯:৪২ পূর্বাহ্ণ | 74 বার

আগষ্ট ২০২০
রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি
« জুলাই    
 
১০১১১২১৩১৪১৫
১৬১৭১৮১৯২০২১২২
২৩২৪২৫২৬২৭২৮২৯
৩০৩১  
যে যুদ্ধে প্রতিপক্ষ শুধুই মানুষ!
এফ এম শাহীন- সম্পাদক, ডেইলি জাগরণ ডট কম ও সাধারণ সম্পাদক, গৌরব ‘৭১’

সমগ্র পৃথিবীতে এক ভয়ানক যুদ্ধ চলছে। করোনা ভাইরাস বনাম মানুষ। এক মানুষকে ভয় পাচ্ছে অন্য মানুষ, ভাইরাসবাহী কোনো মানুষকে দেখলে আতঙ্ক গ্রাস করছে সবাইকে। যেন মানুষের প্রতিপক্ষ হয়ে উঠেছে মানুষ!

পৃথিবীর সব উন্নত দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থাও আজ ভেঙে পড়েছে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র এই করোনা ভাইরাসকে সামাল দিতে গিয়ে। সেই সঙ্গে ভেঙে পড়ছে বিশ্ব অর্থনীতি, ব্যবসা বাণিজ্য ও সামগ্রিক যোগাযোগ। তবে এই যুদ্ধে মানুষের হাতে থাকা শত শত অত্যাধুনিক অস্ত্র থাকার পরও তা কোনো কাজে আসছে না।

এই যুদ্ধে হুঙ্কার ছাড়া মানুষ লক্ষ কোটি টাকার অস্ত্র নিয়ে লেজ গুটিয়ে ঘরে ঢুকে আত্মরক্ষায় ব্যস্ত। শ্রেষ্ঠত্ব দাবি করা মানুষকে আক্রমণ করতে করতে ঘরের ভেতরে অবস্থান নিতে বাধ্য করেছে করোনা। গ্রহ থেকে গ্রহে ছুটে বেড়ানো মানুষ আজ একটি অণু সমান ভাইরাসের কাছে পরাস্ত।

হাজার বছরের সভ্যতা আজ নতুন দিকে বাঁক নিতে চলেছে। আজ সিরিয়া, ইয়েমেন, ইরাক কিংবা গাজায় প্রতিনিয়ত শক্তিশালী দেশের বোমা হামলায় হাজারো নিহতের খবর কেন বন্ধ হয়ে গেল! কিন্তু সেই খবরও হয়তো করোনা-উত্তর পৃথিবীতে দেখা যাবে আবারো! আজ বিশ্বের ক্ষমতাধর যুদ্ধবাজরা নিজেদের ঘর সামলাতেই ব্যস্ত।

আজ মৃত্যু আর মহামারীর সংক্রমণের খবরে হেডলাইন হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি, চীন, ফ্রান্স, স্পেন, যুক্তরাজ্য, ইরান কিংবা পর্তুগাল! অনেকে মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির শোধ বলে মনে করছেন আবার অনেকে মনে করছেন এমনকি অন্ধভাবে বিশ্বাস করছেন, এটি ঈশ্বর প্রদত্ত গজব আবার কেউ কেউ ভাবছেন মনুষ্য সৃষ্ট এক জৈব অস্ত্রের নাম করোনা ভাইরাস।

তবে আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাস, এটি প্রকৃতির প্রতিশোধ। মানুষ তার বাড়াবাড়ির চ‚ড়ান্ত স্তরে পৌঁছে গিয়েছিল। কোটি কোটি জীবের আবাসস্থল এই পৃথিবীকে মানুষ শুধু তাদের নিজেদের প্রয়োজনে গ্রাস করেছে, দখল করেছে অন্যান্য জীবন্ত প্রাণীর আবাস। উজাড় করেছে অরণ্য আর নীড়হারা হয়েছে কোটি কোটি প্রাণ।

মানুষ তার জীবন ধারণ করার জন্য প্রতিদিন কত কোটি জীব হত্যা করে তার হিসাব কোনোদিন করিনি আমরা। কেন করতে যাব, যেখানে মানুষই তার স্বজাতি মানুষকে হত্যা করছে ভ‚মির জন্য, খাবারের জন্য, বিশ্বাসের জন্য। হত্যা করছে সভ্যতার জন্য, হত্যা করেছে ক্ষমতা, লোভ, মোহ ও ভোগ উপভোগের জন্য। সেখানে আমরা ভুলে গেছি এই প্রকৃতির দানে সমগ্র প্রাণ বেঁচে আছে ছোট্ট এই গ্রহে।

বায়ু, জল আর ভ‚মির আদি দানের কথা ভুলে আমরা ছুটছি ভিনগ্রহে ঠাঁই হয় কিনা। আমরা ভুলে গেছি প্রকৃতি স্থবির নয়, সে সজীব যে কথা শত বছর আগে আমাদের জানিয়ে গেছেন আচার্য জগদীশ চন্দ বসু। এমনকি প্রতিটি বৃক্ষ অনুভ‚তিপ্রবণ, আঘাতে সে ন্যুব্জ হয়, ভালোবাসায় উৎফুল্ল হয়।

প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল থাকা মানুষ নিষ্ঠুরভাবে প্রকৃতি ও পরিবেশকে বিনাশ করে চলেছে যুগ যুগ ধরে। আমরা জানি, প্রত্যেক ক্রিয়ার সমান প্রতিক্রিয়া আছে। নিউটনের সেই তৃতীয় সূত্র ভুলে গিয়ে মানুষ নিজের অকল্যাণ নিজেই ডেকে আনে।

এই যে নির্বিচারে আমরা সৃষ্টিকর্তার সাজানো প্রকৃতির বিনাশ করছি, এতে চ‚ড়ান্ত ভুক্তভোগী কে হচ্ছে? প্রকৃতি ও পরিবেশের রক্ষক হওয়ার বদলে আমরা যখন তার ভক্ষক হয়ে দাঁড়াই, তখন তার ফল কী ভয়াবহ হতে পারে, সে কথার আরেক উদাহরণ করোনা ভাইরাস বললে ভুল হবে কি?

প্রকৃতি যদি সজীব হয়, যদি তার অনুভ‚তি থাকে, তাহলে তার এমন প্রতিশোধে অবাক হওয়ার কিছু তো নেই। এখন প্রকৃতি মুখ ফিরিয়ে নিয়ে ঘোষণা করেছে এই পৃথিবী শুধু মানুষের নয়! সব জীব ও প্রাণের ন্যায্যতা চাই। মহান সৃষ্টিকর্তাও হয়তো মানুষের দম্ভ আর অত্যাচারের হিসেব চুকাতে বর্তমান মানুষের আহাজারি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবেন।

আজ জাপানের রাস্তায় যখন দেখি হরিণের দল দৌড়াচ্ছে, পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত কক্সবাজারে মানুষবিহীন নির্জনতায় খেলা করছে অজস্র ডলফিন আর সাগরলতারা ফুটে আছে সাগরের পারজুড়ে তখন ভাবি মানুষের অত্যাচারে কী ক্ষতিই না হয়েছে প্রকৃতি ও পরিবেশের! মানুষের দখলের ইতিহাস মনে পড়ে বারবার। আমরা কি পারব প্রকৃতির সেই ক্ষত মিটিয়ে এই পৃথিবীকে সাজিয়ে তুলতে পুনরায়।

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস করোনা ভাইরাসকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ‘সবচেয়ে ভয়াবহ সংকট’ বলে অভিহিত করেছেন। জাতিসংঘপ্রধান সতর্ক করেছেন, করোনা ভাইরাস মহামারী বিশ্বকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে সবচেয়ে মহাসঙ্কটে ফেলেছে।

জনস হপকিনস ইউনিভার্সিটির বরাতে আলজাজিরা জানিয়েছে, বিশ্বজুড়ে ৮ লাখ ৫৭ হাজার মানুষের করোনা সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। এখন পর্যন্ত ১ লাখ ৭৮ হাজার ব্যক্তি করোনামুক্ত হয়েছেন। করোনার আক্রান্ত হয়ে ৪২ হাজার মানুষ মারা গেছেন। তবে বিশ্বব্যাপী মহামারী রূপে ছড়ানো করোনা ভাইরাস নিয়ে চীনের বিরুদ্ধে মিথ্যা এবং তথ্য লুকানোর অভিযোগ করে আসছে বিভিন্ন দেশ এবং গণমাধ্যমে।

এদিকে ইচ্ছাকৃতভাবে করোনা ভাইরাস ছড়ানোর অভিযোগে চীনের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে ২০ ট্রিলিয়ন ডলারের মামলা করা হয়েছে। এছাড়া অস্ট্রেলিয়ার এমপি জর্জ ক্রিস্টেনসেনও করোনা ভাইরাসের জন্য চীনের কাছে ক্ষতিপূরণ চেয়েছেন।

প্রায় তিনমাস মাস সময় পেলেও তা কাজে লাগাতে পারেনি বাংলাদেশ। প্রেস ব্রিফিংয়ে করোনা মোকাবিলার সক্ষমতার কথা বারবার বলা হলেও অব্যবস্থাপনার চিত্র প্রথম থেকেই স্পষ্ট। সেই সঙ্গে কয়েক মন্ত্রী-আমলার অবহেলা উদাসীনতা আজ দেশবাসীর কাছে জলের মতো পরিষ্কার। সাধারণ জনতাকে মানুষ হিসেবেই গণ্য করে না ক্ষমতাধর কিছু মানুষ। তারই বহিঃপ্রকাশ দেখলাম আমরা করোনা নিয়ে আলাপ-আলোচনা আর ব্রিফিংয়ে এই বিশ্ব মহামারীতে।

করোনা ভাইরাসের উপসর্গ নিয়ে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মানুষ মারা যাচ্ছে। এমন উপসর্গের উপস্থিতির পরও সবাইকে টেস্টের আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। যা সাধারণ মানুষের মনে উদ্বেগ ও শঙ্কা তৈরি হয়েছে। দেখা যাচ্ছে মৃত্যুর পর তাদের বাড়ি লকডাউন করা হচ্ছে।

যার ফলে স্থানীয় মানুষ আরো বেশি আতঙ্কিত হয়ে পড়ছেন। সাধারণের মনে প্রশ্ন আমরা নিয়ন্ত্রণে আনতে পারলে তাহলে কেন লাখ লাখ বেডের হাসপাতাল তৈরির ঘোষণা আসছে? বিগত চার বছরের মধ্যে এই মৌসুমেই সবচেয়ে বেশিসংখ্যক মানুষ শ্বাসতন্ত্রের রোগে আক্রান্ত হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে পাওয়া তথ্য তাই বলছে। শ্বাসতন্ত্রের প্রদাহজনিত রোগ বা অ্যাকিউট রেসপিরেটরি ইনফেকশন (এআরআই) বলতে সর্দি-কাশি, গলাব্যথা থেকে শুরু করে ব্রঙ্কাইটিস, ব্রঙ্কুইলাইটাস ও নিউমোনিয়াকে বোঝানো হয়ে থাকে।

মক্কা-মদিনায় নামাজ আদায় বন্ধ করতে পারলেও আমরা জুমাবার বা মসজিদে নামাজ আদায়ের ব্যাপারে স্পষ্ট বক্তব্য দেখিনি। সব এয়ারপোর্ট বন্ধ হলেও কোনো শক্তির ওপর ভর দিয়ে আমরা আমাদের এয়ারপোর্ট খোলা রেখেছি সেই জবাব কেউ চাইছি না আবার হোম কোয়ারেন্টাইনের নামে প্রবাসী ভাইয়েরাও সর্বোচ্চ উদাসীনতা দেখিয়ে সব নির্দেশনা অমান্য করে ঘুরে বেড়িয়েছেন! পুরো জাতিকে ফেলেছেন ঝুঁকিতে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মহামারী করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ মোকাবিলায় স্বীকৃত ওষুধ ও প্রতিষেধক এখনো উদ্ভাবন করা হয়নি। তাই রোগ শনাক্তকরণে পরীক্ষা জোরদার করতে হবে। স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করার পাশাপাশি পরস্পরের মধ্যে কমপক্ষে ৩ ফুট বা ১ মিটার দূরত্ব বজায় রাখা, জনসমাগম এড়ানো, গণপরিবহন ব্যবহার না করার মতো বিষয়গুলো মেনে চলতে হবে।

করোনা ভাইরাসের সংক্রমণে বিশ্বে প্রতিদিনই লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা। সংক্রমণ ঠেকাতে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখাই আপাতত সমাধান। আগামী ১৫ দিনের জন্য আমাদের ভীষণ সতর্ক থাকতে হবে। মানুষের নিরাপত্তার জন্য বন্ধ করতে হবে সব রকমের গণজমায়েত।

তাই দ্রুত মানব কল্যাণে হেলাফেলা না করে স্বাস্থ্য বিধিনিষেধ মতো ঘর থেকে বের হওয়া যাবে না। অতি জরুরি না হলে যত কষ্টই হোক না কেন নিজের জন্য, নিজের পরিবার তথা রাষ্ট্রের জন্য ঘরে থাকতে হবে।

জরুরি অবস্থা কিংবা সাধারণ ছুটি করোনামুক্ত করবে না কিন্তু এই ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে বাঁচাবে পুরো জাতিকে। তাই কর্তৃপক্ষের কাছে আহ্বান, অন্য কোনো বাহিনী দিয়ে এই ভাইরাস সংক্রমণ কমানো গেলেও মুক্ত হওয়া সম্ভব নয়।

দ্রুত চিকিৎসা সেবার সঙ্গে জড়িত সবার সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করে ঐক্যবদ্ধভাবে করোনার সঙ্গে যুদ্ধ করতে হবে। এই মহামারী আর আতঙ্কের মধ্যে বিশ্বাস করতে চাই, সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত ও সম্মিলিত কার্যক্রমের মাধ্যমে ঘুরে দাঁড়াবে বাংলাদেশ, ঘুরে দাঁড়াবে বিশ্ব। প্রকৃতির সঙ্গে মানবিক আচরণে করোনার সঙ্গে মানুষের এই যুদ্ধ থামবে। পৃথিবী তার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে। মানুষের জয় হবেই।

লেখক: এফ এম শাহীন- সম্পাদক, ডেইলি জাগরণ ডট কম ও সাধারণ সম্পাদক, গৌরব ‘৭১’

মোরেলগঞ্জে গরুসহ ট্রাক নদীতে

২০১১-২০১৬ | কোনো সংবাদ বা ছবি অন্য কোথাও প্রকাশ করবেন না

Development: Zahidit.Com

ঘোষনাঃ
Translate »